সুজান ম্যাইসিলাস ও নিকারাগুয়া

নিকারাগুয়ার মনিম্বো গ্রামে সুজান ম্যাইসিলাস ক্যামেরা হাতে। সেপ্টেম্বর ১৯৭৮ | ছবি: এলেএইন দিজিয়েন সিগমা

নিকারাগুয়ার মনিম্বো গ্রামে সুজান ম্যাইসিলাস ক্যামেরা হাতে। সেপ্টেম্বর ১৯৭৮ | ছবি: এলেএইন দিজিয়েন সিগমা

১.

সাউথ ভার্জিনিয়া থেকে নিউইয়র্ক। ৪৪ ইরভিং স্ট্রী থেকে মট স্ট্রীট। এমনি বেড়ে ওঠার নানা জায়গায় কাজের ছাপ রেখেছেন তিনি। ছোট্ট ইটালী নামে পরিচিত মট স্ট্রীটের পাড়ায় আছেন ১৯৭৪ সাল থেকে। ইমিগ্রেন্ট ইটালীবাসিদের আস্তানা নিউইয়র্কের ম্যানহেটেন ডাউন টাউনের মটস্ট্রীটের বেসমেন্টেই এখন আলোকচিত্রী সুজান ম্যাসাইলাস এর স্টুডিও এপার্টমেন্ট। নিজের মতো মগ্ন হয়ে কাজ করেন, কাজ নিয়ে ভাবেন তিনি এখানেই। এই পরিচিত পাড়া একসময় ছিলো অপরিচিত। তখন সুজানের বয়স ২৬ বছর। সাইকেল নিয়ে আসতে যেতে একসময় পরিচয় হয় প্রতিবেশী ইটালীয়ান আমেরিকান কিশোরীদের সাথে। ছবি তোলেন তাঁদের নিয়ে। অপরিচিত জায়গা আর মানুষ পরিচিত হতে থাকে এভাবেই। এরপর অনেক সময় পেরিয়েছে এখন ডক্যুমেন্টারী আলোকচিত্রী সুজান ম্যাইসিলাসকে একবাক্যে সবাই জানেন ম্যাগনাম ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট হিসাবে। ওয়ার ফটোগ্রাফার হিসাবে রয়েছে তাঁর বিশেষ পরিচিতি। ছবি, চলচিত্র এবং বই প্রকাশের এর মধ্য দিয়ে সুজান কাজ করেছেন ল্যাটিন আমেরিকার নিকারাগুয়া, এল সালভাডোর ও চিলির ওপর। কাজ করেছেন কুরদিস্থান এর জনগণের ওপর। এছাড়া আলোকচিত্রী হিসাবে তার যাত্রার শুরুর দিকে কাজের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ৪৪ ইরভিং স্ট্রীট, প্রিন্স স্ট্রীট গার্লস, কার্নিভাল স্ট্রাইপারস, পেন্ডোরা বক্স। রিফুজী নারীদের জীবনসহ নানা বিষয়ে রয়েছে তাঁর কাজ । কাজ করেছেন নাইন/এলেভেন এর ওপরও।

এতসবের মধ্যে নিকারাগুয়া নিয়ে তাঁর লম্বা সময়ের কাজ ১৯৭৯ সালের নিকারাগুয়া বিপ্লবের পর থেকে আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে। একইসাথে আন্তর্জাতিক মহলে সুজানের কাজ এবং নিকারাগুয়া সবার নজরে আসতে শুরু করে। তিনি নিকারাগুয়ার কাজের জন্য রবার্ট কাপা গোল্ড মেডেল এওয়ার্ড পান। এছাড়া গুগেনহেইম (Guggenheim Fellowshipthe ) ফেলোশীপ এবং হার্ভাড আর্টস মেডেলসহ (Harvard Arts medal) নানাভাবে সম্মানিত হন। আলোকচিত্রী ও ব্যক্তি সুজান নিজের কাজে কতটা একাগ্র, কতটা ধারাবাহিক আর সম্পর্কিত তার ছবির মানুষগুলোর সাথে এবং সেই মানুষগুলোর ভাবনার সাথে -- তা তাঁর জীবন ও কাজকে সময় এবং মনোযোগ দিয়ে বোঝাপড়া না করলে পাঠ করা কঠিন।

নিকারাগুয়ার জনগণের সাথে এক গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন সুজান। গত প্রায় ৪০ বছরের টানা সম্পর্কের বয়ান তিনি পাঠককে দিয়েছেন নানা কাজের মধ্য দিয়ে। আন্তর্জাতিক ছবি উৎসব ছবি মেলার দশম আয়োজনে এবার সুজানের নিকারাগুয়ার কাজের একটি অংশ প্রদর্শিত হয়েছে দৃক গ্যালারীতে। সেই সুত্র ধরে তাঁকে নিয়ে লেখা। ২০১১ সালে ব্যক্তিগতভাবে পরিচয় হয় সুজানের সাথে। তখনও বুঝতে পারিনি কতো গুনী একজন মানুষের সান্নিধ্য পাওয়ার সুযোগ হচ্ছে। একজন শিক্ষার্থী হিসাবে যতো তাঁকে জেনেছি ততই তাঁর সম্পর্কে আগ্রহ বাড়তে শুরু করে। এরপর অল্প অল্প করে শুরু হয় তাঁকে নতুন করে চেনা। পড়তে থাকি তাঁকে নিয়ে নানা লেখা, সাক্ষাৎকার; দেখি তার নির্মিত চলচিত্র ও ছবি। আবিষ্কার করি নৃবিজ্ঞানী, আলোকচিত্রী, কিউরেটর, সম্পাদক এবং একজন অত্যন্ত সাহসী ও পরিশ্রমী মানুষকে। অন্যান্য কাজের মধ্যে নিকারাগুয়ার ওপর তার কাজ আর সব পাঠক এর মতো আমাকেও ল্যাটিন আমেরিকার মুক্তির সংগ্রাম এবং নিকারাগুয়ার দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রাম সম্পর্কে বিশেষভাবে আগ্রহী করে তোলে। একজন আলোকচিত্রীর নির্মিত ছবি কিভাবে পাঠককে ইতিহাসের বিষয়ে আগ্রহী ও সংযুক্ত করে তা সুজানের নিকারাগুয়ার ওপরে লম্বা সময় ধরে করা ঐতিহাসিক এই কাজ থেকে টের পাওয়া যায়।

আলোচিত্রী সুজানের কাজ থেকে শেখার আছে অনেক। ফটোসাংবাদিকের প্রায়শই কোন পত্রিকার নির্দেশনায় বা কোন এসাইনমেন্টের চাপে যেভাবে হুড়াহুড়িতে কাজ করতে হয়, তেমন ব্যতিব্যস্ততা বা বিচ্ছিন্নতা কোনটাই একেবারে নেই সুজানের কাজে। এই কাজে রয়েছে দায় এবং দায়িত্ববোধের স্পষ্ট ছাপ। যৌথতার ছাপ। যা কেবল যুদ্ধের লড়াই-সহিংসতা কিংবা ভয়াবহতার কথাই বলে না; বলে যুদ্ধের মধ্য থেকে পাওয়া আশা-দুরাশার দোলাচাল আর স্বপ্ন ও স্বপ্ন ভঙ্গের গল্প। একই সাথে তাঁর এই কাজ দেখায় শক্তির উপস্থিতি, নতুন স্বপ্ন ও ভরসার আভাস। ১৯৭৯ এর বিপ্লব নিকারাগুয়ার মানুষের সংগ্রামী জীবন যাপনে গত চল্লিশ বছরে (১৯৭৯-২০১৯) কি প্রভাব ফেলেছে তার ধারাবাহিক চিত্র রয়েছে সুজানে কাজে। ক্যামেরা নিয়ে সুজানের নিকারাগুয়ায় লম্বা সফর এর সব চিহ্ন এক লেখায় পাওয়া অসম্ভব। আগ্রহী আলোকচিত্রীদের এই বিষয়ে গবেষণার সুযোগ রয়েছে বিস্তর। সুজানকে নিয়ে রয়েছে ইংরেজী ভাষায় তাঁর বই এবং বহু লেখা, গবেষণা, চলচিত্র ও সাক্ষাৎকারের সমৃদ্ধ ভান্ডার। সেই ভান্ডারের সামান্য রশদই আমি পাঠকের কাছে হাজির করবো। বাংলাদেশের আলোকচিত্রী ও পাঠকদের তাঁর গুরুত্বপূর্ণ এই কাজ এবং সুজানকে পরিচিত করাই বাংলা ভাষায় এই লেখার প্রাথমিক উদ্দেশ্য। একইসাথে সুজানের গুণমুগদ্ধ একজন ছাত্র হিসাবে-- শিক্ষক সুজানের প্রতি কৃতজ্ঞতা থেকেও এই লেখার সাহস করা। (পরবর্তীতে এই লেখা ইংরেজীতে অনুদিত হবে)

২.

সুজানের নিকারাগুয়ার ওপর কাজ নিয়ে আলাপ করতে গেলে ব্যক্তি সুজানকে একটু হলেও চেনা জরুরি। আমেরিকান ডক্যুমেন্টারী আলোকচিত্রী সুজানের বেড়ে উঠা নিয়ে তাই দুকথা বলে নিতে চাই। ১৯৪৮ এ যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড বাল্টিমোর এ একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে সুজানের জন্ম। নিউ ইয়র্কের সাউথ ব্রংক্সে প্রাইমারী স্কুলে পড়ার সময়ই তিনি ফটোগ্রাফী শেখেন। স্কুলে ঐসময়ে সাধারণসব ক্যামেরা ব্যবহার করা হতো। একটা ডার্করুম ছিলো শিক্ষার্থীদের তোলা ছবি ডেভেলাপ করার জন্য। সেখান থেকেই সুজানের আলোকচিত্রের হাতে-খড়ি। হাই স্কুলে পড়ার আগ পর্যন্ত সুজান বিভিন্ন সরকারী স্কুলে লেখা পড়া করেন। কলোরাডো রকি মাউন্টেন হাই স্কুলে (Colorado Rocky Mountain School) এসে সুজান ওয়ার্ক-স্টাডি প্রোগামে যুক্ত হয়। ওয়ার্ক স্টাডি প্রোগ্রাম আমেরিকার সরকারের অর্থায়নে একধরনের শিক্ষা কর্মসূচি, যেখানে কমিউনিটির সাথে কাজ করে বা পার্ট টাইম কাজ করে কিছু টাকা উপার্জন করা যেতো, যেটা ছিলো পড়ারই অংশ। তিনি তার এলাকার মানুষদের বাগানে বেড়া লাগানোসহ নানা ধরনের কাজ করেছিলেন। একজন নৃবিজ্ঞানী দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ওয়ার্ক স্টাডি প্রোগ্রামের অংশ হিসাবে সুজান ন্যাটিভ আমেরিকান নাভাহোদের উপর ছবি তোলেন। পরে তিনি সারাহ লরেন্স কলেজ থেকে নৃবিজ্ঞানে বিএ ডিগ্রী এবং হার্ভাড ইউনিভার্সিটি থেকে ভিজুয়াল এডুকেশনে মাস্টার্স করেন। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ এই সময় সুজান নিউইয়র্ক, সাউথ কেরোলিনা ও মিসিসিপতে বিভিন্ন হাই স্কুলে ফটোগ্রাফীর শিক্ষক হিসাবে কাজ করেন। ১৯৭৬ সালে সুজান ফ্রীল্যান্স ফটোগ্রাফার হিসাবে ম্যাগনাম ফটোসে যোগ দেন।সুজান এর মা ছিলেন দক্ষিণ ভার্জিনিয়ার একেবারে গ্রামীন এলাকার বাসিন্দা। বাবা ছিলেন নিউ ইয়র্কের। তাঁদের বিয়ের পর সুজানের মা দক্ষিণ ভাজির্নিয়া থেকে চলে আসেন উত্তরে। কিন্তু ঐ দক্ষিণাঞ্চল ছিল সুজানের ভাষায় তার জীবনে শুরুর দিককার অভিজ্ঞতা অর্জনের জায়গা। তাঁর মা ছিলেন ১৯৬০ এর দশকের প্রথম দিকে সিভিল রাইটস ম্যুভমেন্ট এর অংশ হিসাবে ওপ্যান হাউজিং ম্যুভমেন্ট একজন সক্রিয় কর্মী। তার মায়ের চিন্তা ও কাজ তাকে প্রভাবিত করেছিলো। মায়ের কাছ থেকেই তিনি পেয়েছিলেন সামাজিক সচেতনতার মূল্যবোধ। সুজানের মা দক্ষিণ থেকে উত্তর এ আসার অভিজ্ঞতা এবং এই দু অঞ্চলের যে সংস্কৃতিগত বৈষম্য তা সুজানকে বুঝতে সাহায্য করেন। কোন রকম রাগ-ক্ষোভ ছাড়া এমনভাবে তিনি বোঝান, যাতে সুজান এর মধ্যে একটা নিজেস্ব বোঝা-পড়া তৈরী হয়। নিউইয়র্কের সীমানার কাছাকাছি থেকেও নিউইয়র্ক এর চলতি সংস্কৃতি সুজানের কাছে তেমন কোন বিশেষ অর্থবহন করেনি।

সুজানের ছবি তোলা বিষয়ে আগ্রহের শুরুর দিকের স্মৃতি সুজানের কাছে খুব পরিষ্কার না। তারপরও ক্রিস্টেন লুবেনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে সুজান জানান তার বাবার কাছ থেকে কিভাবে ছবি তোলা বিষয়ে জানতে পেরেছিলো। সুজানের বাবা ছিলেন চিকিৎসক। তিনি পরিবারের অল্প কিছু ছবি তুলেছিলেন। সুজান সেই ছবিগুলো তাঁর বাবাকে ডেভেলাপ করতে দেখতো। আর তাঁর কাজিন এলসা ছিলো ছবি তোলার বিষয় খুবই সিরিয়াস। এলসা ছোট বাচ্চাদের ছবি তুলতো আর ক্লায়েন্টদের জন্য সুন্দর সুন্দর ছবির বই বানাতো। সুজান তার ছোট বেলায় অনেক রকম আর্ট ওয়ার্ক এর সাথে যুক্ত ছিল। তাদের এলাকায় একজন ভাস্কর্য্য শিল্পী ছিলেন। স্কুলের পর সুজান তাঁর সাথে সময় কাটাতো। এছাড়া ছোট বেলায়ই সুজান নিউইয়কের মোমা মিউজিয়ামসহ অন্যান্য গ্যালরীতে ঘুরে বেড়িছেলেন মা-বাবার সাথে। সুজানের বাবার আগ্রহেই বাড়ীতে শিল্প চর্চা নিয়ে আগ্রহ ছিলো। সুজানের চাচা ঐ সময়ে নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটানে স্ট্যাবেল গ্যালারীরর ম্যানেজার ছিলেন। ঐখানে অনেক নাম করা বড় বড় শিল্পীর কাজ প্রদর্শিত হতো। যাদের মধ্যে এন্ডি ওয়াহোল (Andy Wahol) এর নাম উল্লেখযোগ্য। এন্ডি ছিলেন আমেরিকান আর্টিস্ট, ডিরেক্টর ও পরিচালক। তিনি ভিজুয়াল আর্ট মুভমেন্ট এর নের্তৃত্ব দিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে আরো ছিলেন ফরাসী ভাস্কর্য্য শিল্পী পপ আর্ট মুভমেন্টের সদস্য মারিসোল এস্কোবার (Marisol Escobar), যিনি নিউ ইয়র্কে থাকতেন। ছিলেন পপ আর্টের সাথে যুক্ত শিল্পী রবার্ট ইন্দয়ানার (Robert Indiana) মতো অনেকে। সুজানের সাথে এমনি আরো অনেক আর্টিস্টের পরিচয় হয়, যারা আর্টিস্ট হিসাবে নিবেদিত প্রাণ ছিলেন।
সুজান এ নিয়ে বলেন: ‘‘ কিন্তু আমি কখনো আর্টিস্ট হতে চাইনি। সত্যি বলতে আমি এখনো চাই না। ... কেবল আর্টিস্ট কমিউিনিটির মধ্যে কাজ করে এমন একজন আর্টিস্ট হিসাবে আমি নিজেকে দেখি না। আমি অনেক বেশী আগ্রহী কমিউনিটির বিষয়ে, যাদের মধ্য থেকেই প্রকৃত অর্থে কাজ তৈরী হয়। ‘ফটোজার্নালিজমে’ এর সেই সংস্কৃতিকে আমি বিরোধীতা করি যা একজনের কাজকে একটা বাক্সে বন্দী করে ফেলে।’’

৩.

সুজান ম্যাইসিলাসের নিকারাগুয়ার জনগণের সাথে নিবীড় সম্পর্ক টের পাওয়া যায় তাঁর কাজে। ক্যামেরা হাতে ত্রিশ বছর বয়সী তরুণ সুজান প্রথম নিকারাগুয়ায় পৌছান ১৯৭৮ এর জুনে। ঐ সময়টা ছিলো বিপ্লবের মাত্র এক বছর আগে। ঐ বছরই জানুয়ারিতে নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় সমোজা সরকারের হাতে নিকারাগুয়ার বিরোধী দলের পত্রিকা ল্যা প্রেনসা (La Prensa) এর সম্পাদক জোআকুইন চামোররো (Joaquin Chamorro) নিহত হবার খবর ছাপা হয়। এই খবর সুজানকে ভারাক্রান্ত করে। তখনও সুজান জানেন না নিকারাগুয়া কোথায়, নিকারাগুয়ার সাথে আমেরিকার সম্পর্ক এবং রাজনীতির ইতিহাস। ঐ ঘটনার পর কোন এসাইনমেন্ট ছাড়া, তেমন একটা স্প্যানিশ ভাষা জানা ছাড়াই একেবারেই ব্যক্তিগত উদ্যোগে খুব অল্প কিছু ফিল্ম নিয়ে তিনি নিকারাগুয়া পৌঁছান। তখনও তিনি জানেন না যে এর পরের ১০ বছর তিনি ঐখানে ছবি তুলে যাবেন।

তিনি বলেন : ‘‘যখন আমি প্রথম নিকারাগুয়া যাই আমি কখনো কল্পনাও করতে পারিনি পরের ১০ টা বছর সেখানে ছবি তুলবোা. .. ইতিহাস পথেই তৈরী হয়েছিলো এবং কেউ জানতো না এটি কোন পথে এগুবে।’’ পিকচারস ফর্ম এ রেভ্যুলুশান ডকুম্যান্টোরী ১৯৯১, ফিল্মে এ তিনি আরো বলেন : ‘‘জনগণ বিশ্বাস করতো তাঁরা যা করছে তাতে কিছু একটা হবেই। আর আমি তাঁরা কী করছে সেটা ডক্যুমেন্ট করা এবং এর স্বাক্ষ্যী হবার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করি। একবছরের মধ্যে সমোজা সরকার সরে পড়তে বাধ্য হয়। -এটা একটা আশা আর স্বপ্নের সময় ছিল এবং আমি নিজেকে এর অংশীদার হিসাবে খুঁজে পাই’’।

নিকারাগুয়ার রাজধানী মানাগুয়ায় ১৯৭৯ এর বিপ্লবের বিজয় উৎসব প্রবেশ করছে সেন্ট্রাল প্লাজায়। ২০ জুলাই, ১৯৭৯। ছবি: সুজান মাইসিলাস। ম্যাগনাম ফটোস।

নিকারাগুয়ার রাজধানী মানাগুয়ায় ১৯৭৯ এর বিপ্লবের বিজয় উৎসব প্রবেশ করছে সেন্ট্রাল প্লাজায়। ২০ জুলাই, ১৯৭৯। ছবি: সুজান মাইসিলাস। ম্যাগনাম ফটোস।

নিকারাগুয়ার ওপর সুজানের কাজকে পাঠ করতে হলে নিকারাগুয়ার রাজনীতির ইতিহাসের প্রাথমিক দিকের কিছু যোগসূত্র না করে এগুনো কঠিন। এবার আসি সেই প্রসঙ্গে। নিকারাগুয়া মধ্য আমেরিকার একটি দেশ। ল্যাটিন আমেরিকার এই দেশটির উত্তরে হন্ডুরাস আর দক্ষিণে কোস্টারিকা। স্প্যানীশ ভাষীয় নিকারাগুয়ার জনগণের দীর্ঘ ইতিহাস মার্কিন শাসন এবং প্রভাবের বিরুদ্ধে লড়াই সংগ্রামের ইতিহাস। স্প্যানীশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে জাতীয় স্বাধীনতা লাভ করে এই দেশ ১৮২১ সালে। কিন্তু এরপরেও এই দেশ ছিলো মার্কিন আধিপত্য বলয়ের মধ্যে। ১৯৩৬ থেকে ১৯৭৯ এই ৪৩ বছরের লম্বা সময়ে নিকারাগুয়ায় সমোজা সরকার শাসন চালায়। সমোজা সরকার এবং সেনাবাহিনী ছিল মার্কিন সরকারের প্রভাবাধীন। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলো নিকারাগুয়ার ন্যাশনাল গার্ড এর সেনাধক্ষ্য এনাস্টিসিও সোমোজা (Anastasio Somoza Dabayel)। তার পর তার দুই ছেলেও শাসন চালায়। এই শাসন আমলই সমোজা শাসন নামে পরিচিত। তাদের শাসন আমলে সেনাবাহিনীর প্রভাব এবং মার্কিন আধিপত্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে স্যান্ডিনিস্তারা। আগাস্টো সিজার সান্ডিনিও (Augusto César Sandino) নামে নিকারাগুয়ার বীর নেতার নামেই ১৯৬২ সালে সান্ডানিস্তা ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট ( এফএসএলএন) গড়ে উঠে।

সান্ডিনিও ১৯২৭ থেকে ১৯৩৩ পর্যন্ত নিকারাগুয়ায় মার্কিন সামরিক আধিপত্যের বিরূদ্ধে লড়াইয়ে নের্তৃত্ব দেন। ১৯৩৪ সালে সান্ডিনিও ন্যাশনাল গার্ডের চক্রান্তে নিহত হন। এফএসএলএন এর সদস্যরাই সান্ডানিস্তা নামে পরিচিত। কিউবার বিপ্লব এবং ভিয়েতনামের যুদ্ধ অনেক আলোড়িত করেছিলো সান্ডানিস্তা নের্তৃত্বকে। সুজানের ছবি ও চলচিত্রে এই সান্ডানিস্তাদের আবির্ভাব ঘটে বারবার। ১৯৭৯ সালের ১৭ জুলাই স্যান্ডানিস্তাদের লড়াই সংগ্রামের মুখেই ২য় সমোজা আমেরিকায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। ১৯৭৮ থেকে তাঁদের সংগ্রামের স্বাক্ষী হয়ে থাকে সুজানের ছবি। সান্ডনিস্তারা অস্থায়ী সরকার গঠন করে। কিন্তু এখানেই শেষ হয়নি। পরবর্তীতে পরাজিত ন্যাশনাল গার্ড বাহিনী এবং সমোজার সমর্থকরা কান্ট্রা নামে নতুনভাবে সংগঠিত হতে থাকে এবং মার্কিন প্রভাব বলয়ের মধ্য দিয়ে সান্ডিনিস্তা সরকার বিরোধী আন্দোলনে নেতৃর্ত¡ দেয়া শুরু করে। সুজানের ভাষায়--- ‘‘১৯৭৯ এর বিপ্লবের পর সব কিছু জটিল হয়ে উঠতে শুরু করে। শান্তির বদলে সেখানে আরেকটা যুদ্ধ শুরু হয়। কন্ট্রা যুদ্ধ।” (পিকচারস ফরম এ রে‌্যভুলেশন: ১৯৯১)।

তখন আমেরিকা নিকারাগুয়ায় নানা রকম অর্থনৈতিক-সামরিক চাপ, নিষেধাজ্ঞা জারি করে। শুরু হয় নতুন যুদ্ধ। স্নায়ু-যুদ্ধ। আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলো নিকারাগুয়ায় নানা চাপ অব্যাহত রাখে। হন্ডুরাসে ঘাটি গড়া কন্ট্রা আর আমেরিকান সৈন্যরা তেল সম্পদসহ অন্যান্য খনিজসম্পদ, বন্দর, কৃষি সব কিছুতেই হামলা চালায়। চিনি আমদানি ৯০ ভাগ কমিয়ে দেয়া হয়। স্থগিতাদেশ দেয়া হয় কলা রপ্তানীতেতে। চলতে থাকে নিষ্ঠুর নির্মম নির্যাতন আর হত্যাযজ্ঞ। আর একইসাথে চলে সান্ডানিস্তা বিরোধী প্রচারণা। ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত চলে কন্ট্রা যুদ্ধ। এই পুরো সময় সুজান ফিরে ফিরে যান নিকারাগুয়ায়। ১৯৯০ এর নির্বাচনে সান্ডনিস্তাাদের পরাজয় হয় ন্যাশনাল অপজিশন ইউনিয়ন নামের দলের কাছে। এরপর নির্বাচন প্রক্রিয়ার মধ্যে ঢোকে নিকারাগুয়ার জনগণ। সেখানে ১৯৯০ এর পর ২০০৬ সালে প্রায় ১৬ বছর পর ক্ষমতায় আসে ডেনিয়েল ওর্তেগা। ওর্তেগার ভ’মিকাও এখন প্রশ্নের মুখোমুখি। ২০১৮ এর এপ্রিল-মে জুড়ে আবারও ব্যাপক ছাত্র বিক্ষোভ হয়। যেখানে ছাত্রসহ জনতারা রাস্তায় নেমে আসে। এই পুরো সময়জুড়েই সুজানের পদচারণা রয়েছে।

১৯৭৯ তে যখন সমোজা দেশ ছেড়ে মার্কিনযুক্তরাষ্ট্র চলে যায় তখন অন্য অনেক আলোকচিত্রী নিকারাগুয়ায় ছেড়ে চলে যায়। কিন্তু সুজান থেকে যায়। দীর্ঘ ১০ বছর সুজান নিকারাগুয়ায় ইতিহাসের স্বাক্ষী হয়ে পরে। সুজানকে নিকারাগুয়ার লোকজন স্পীনিশ ভাষায় ডাকতো লস মুচাচোস (los muchachos) নামে। স্প্যানিস ভাষায় তরুণদের লস মুচাচোস নামে ডাকা হতো। প্রথম একবছর সুজান প্রায় হাজারেরও বেশী ছবি তোলেন। তার মধ্য থেকে মাত্র ৭০ টি ছবি দিয়ে ১৯৮১ সালে নিকারাগুয়া জুন ১৯৭৮-জুলাই ১৯৭৯ নামে বই প্রকাশ প্রায়। ফেন্টন (Pantheon) প্রকাশনা এই বইটি প্রকাশ করে। পরবর্তীতে এ্যাপারচার (Aperture) ২০০৮ এ এই বইটি পূর্ণমুদ্রণ করে।

বিপ্লবের ঠিক আগের দিন পাবলো বারেতা সমোজা ন্যাশনাল গার্ডের রেজিমেন্টের দিকে মোল্টোভ ককটেল ছুড়ে মারেন। ১৬ জুলাই, ১৯৭৯ | ছবি: সুজান মাইসিলাস | ম্যাগনাম ফটোস

বিপ্লবের ঠিক আগের দিন পাবলো বারেতা সমোজা ন্যাশনাল গার্ডের রেজিমেন্টের দিকে মোল্টোভ ককটেল ছুড়ে মারেন। ১৬ জুলাই, ১৯৭৯ | ছবি: সুজান মাইসিলাস | ম্যাগনাম ফটোস

৪.

১৯৭৯ সালে সোমোজা সরকারের পতনের ঠিক আগের দিন তোলা একটি ছবি বিপ্লবের প্রতীকে রুপান্তরিত হয়। ১৬ জুলাই একজন সান্ডনিস্তা ন্যাশনাল গার্ডের হেডকোয়ার্টেরের দিকে হাতে বানানো পেপসির বোতলে মোল্টোভ ককটেল বোমা ছুড়ে মারে। সেই দৃশ্য সুজান তার ক্যামেরায় ধারণ করেন। তিনি ছবিটির নাম দিয়েছিলেন মোল্টোভ ম্যান। ১০ বছর পর তিনি সেই লোকের পরিচয় খুঁজে পান যার নাম পাবলো বারেটা (Pablo de Jesus Bareta’’ Arazu)। আইকনিক এই ছবি কেবল আন্তর্জাতিক মিডিয়ায়ই নয় ছড়িয়ে পড়ে নিকারাগুয়ার পথে প্রান্তরে-জনগণের মাঝে। এই ছবি ব্যবহৃত হয় টিশার্ট, ম্যাচ বাক্স; স্ট্যাম্প; বিলবোর্ড; লিফলেট; পোস্টার; মানুষের বাড়ীর দেয়ালে-দরজায়; রাস্তার ধারে বানানো মূর্তিসহ বিভিন্ন জায়গায়। বেশীরভাগ আলোকচিত্রীরা ঐসময়ে সাদাকালো ছবি তুলতেন। কিন্তু সুজানের রঙ্গিন ছবি যখন টাইমস পত্রিকার কভারসহ বিভিন্ন পত্রিকায় ছাপা হতে থাকে তখন ল্যাটিন আমেরিকার এই ছোট দেশটির সম্পর্কে আন্তর্জাতিক পর্যায় মনোযোগ বৃদ্ধি পায়। এরই মধ্যে সুজান ম্যাগনাম থেকে পূর্ণ সদস্য হবার প্রস্তাব পান। এবং পূর্ণ সদস্যপদ লাভ করেন ১৯৮০ সালে। সুজানের নিকারাগুয়ার ওপর বেশ কিছু পরিচিত ছবি এবারের ছবি মেলায় প্রদর্শিত হয়েছে। সাথে ছিলো তার চলচ্চিত্র পিকচারস ফর্ম এ রেভ্যুলুশান থেকে নেয়া বেশ কয়েকটি সাক্ষাৎকারের অংশ। এর মধ্যে ছিলো আগাস্টো, জাস্টো এবং মোল্টোভ ম্যান পাবলোর সাক্ষাৎকার। এবং রিফ্রেমিং হিস্ট্রী ও নিকারগুয়ার ২০১৮ এর ছাত্র জনবিক্ষোভের ছবি, গান ও চলচিত্র এর অংশ বিশেষ।

সুজানের পিকচারস ফরম এ রেভ্যুলেশন নামের প্রামান্য চিত্রটি নিকারাগুয়ার ওপর তাঁর প্রথম বই প্রকাশের ১০ বছর পরের কাজ। সুজান ১৯৮১ সালে প্রকাশিত তাঁর বই নিকারাগুয়া জুন ১৯৭৮-জুলাই ১৯৭৯ নিয়ে আবার নিকারাগুয়ায় ফিরে যান পরিচিত এলাকায়। খুঁজে বের করার চেষ্টা করেন যাদের ছবি তুলেছেন তাঁদের। খোঁজেন ছবির পেছনের সেই মানুষদের গল্প। কাউকে কাউকে খুঁজেও পান। একই সাথে নিকারাগুয়ার জনগণের কাছ থেকেই জানেন বিপ্লব তাঁদের জীবনে কী প্রভাব ফেলেছে। এসবের উপর ভিত্তি করেই ১৯৯১ সালে নির্মান করেন প্রামাণ্য চিত্র পিকচারস ফরম এ রেভ্যুলেশন। চলচিত্র নির্মাতা ও সুজানের দীর্ঘ দিনের বন্ধু এবং স্বামী রিচার্ড পি রোজারস (Richard P. Rogers 1943-2001) এবং আলফ্রেড গুজেটি (AlfredgGuzzetti) যৌথভাবে তৈরী করেন এটি। এখানে সুজান বোঝার চেষ্টা করেন নিকারাগুয়ার জনগণ কিভাবে ঐদিনগুলোকে মনে রেখেছে। তিনি সাক্ষাৎকার নেন সেই মানুষগুলোর এবং ভিডিও রেকর্ড করেন। এই কাজ হয়ে উঠে একটি যৌথ কাজ। ছবির মানুষগুলো তাঁদের ইতিহাস নিয়ে কথা বলে, নিজস্ব মতামত যুক্ত করে চলচিত্রটিকে নিকারাগুয়ার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ সংযুক্তি হিসাবে নতুন করে স্থান দেয়।

এই প্রামাণ্য চিত্রে ব্যবহৃত কয়েকটি ছবি এবং সাক্ষাৎকার নিয়ে বলতেই হয়। সুজানের একটি ছবিতে সান্ডানিস্তাার বিদ্রোহীরা তাদের সহযোদ্ধাদের লাশ এর কফিনে এফএলএনএস এর পতাকা দিয়ে ঢেকে মিছিল করছিলো। সুজান নিকারাগুয়া গিয়ে দশ বছর পর সেই মিছিলে অংশগ্রহণকারী একজনকে খুঁজে বের করে, যে মিছিলে প্রথম দিকে কফিন কাঁধে নিয়ে স্লোগান দিচ্ছিলো। খুব অল্প বয়স্ক এক তরুণ। সুজানকে দেয়া সাক্ষাৎকারে সেই তরুণ দশ বছর আগের স্মৃতিতে ফিরে গিয়ে বলেন---‘‘সান্ডনিস্তাদের পতাকা নিয়ে মিছিল করাটা অনেক ঝুঁকিপূর্ণ ছিলো। কিন্তু এটাঁই প্রথম সুযোগ ছিলো আমাদের জন্য, যেখানে এই লড়াইয়ের ভ্যানগার্ডদের পতাকা দেখানোর সুযোগ হয়। এটা ছিলো আমাদের বন্ধু সহযোদ্ধাদের শেষকৃত্য অনুষ্ঠানের আয়োজন। ..

নিহতদের কফিন নিয়ে মিছিল | ১৯৭৮ | ছবি: সুজান ম্যাসিলাস | ম্যাগনাম ফটোস

নিহতদের কফিন নিয়ে মিছিল | ১৯৭৮ | ছবি: সুজান ম্যাসিলাস | ম্যাগনাম ফটোস

আমরা জানতাম যেকোনো মুহুর্তে আক্রান্ত হতে পারি। ন্যাশনাল গার্ডের সৈনিকরা যে কোন সময় আমাদের কফিন মিছিলকে ভন্ডুল করে দিতে পারে। কিন্তু আমরা আমাদের বন্ধুদের, যারা এই সংগ্রামে প্রাণ হারিয়েছে, তাদের মৃত দেহ বহন করছিলাম। আমরা মরতে প্রস্তুত ছিলাম কিন্তু তাঁদের লাশ ফেলে চলে যাওয়া বা যে কোন জায়গায় ছুড়ে ফেলতে একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না। আমরা ভয় পাইনি, আমরা নিরাপদ বোধ করেছি কারণ আমাদের ছিল বিপুল জনসমর্থন।” একটা পর্যায় ওরা কফিনের মুখ খুলে ফেলে একধরনের বিশেষ আয়োজন করেছিলো ইউনিভার্সিটির ভেতরে। এরপর তারা মারমুখো হয়ে মিছিল নিয়ে এগুতে থাকে সুজান সামনেই ছিলো। ঐ মিছিল থেকে সান্ডানিস্তারা সুজানের দিকে একটি বুলেট ছুড়ে বলে ‘মেইড ইন ইউএসএ’’ । প্রথমবারের মতো একজন আমেরিকান হিসাবে দ্বিধায় পড়ে যায় সুজান।

আর্লেন সিউ নামে তিনবছর আগে (১৯৭৮) নিহত একজন নারী গেরিলা যোদ্ধার ছবি নিয়ে নিহত ছাত্র নেতাদের স্মরণে মিছিল। এফএসএলএন এর পতাকাসহ মিছিল। ১৯৮১ নিকারাগুয়া। ছবি: সুজান ম্যাইসিলাস। ম্যাগনাম ফটোস

আর্লেন সিউ নামে তিনবছর আগে (১৯৭৮) নিহত একজন নারী গেরিলা যোদ্ধার ছবি নিয়ে নিহত ছাত্র নেতাদের স্মরণে মিছিল। এফএসএলএন এর পতাকাসহ মিছিল। ১৯৮১ নিকারাগুয়া। ছবি: সুজান ম্যাইসিলাস। ম্যাগনাম ফটোস

সুজানের একটি ছবিতে নিকারাগুয়ার মনিম্বোতে মাটি আর ইটের রাস্তা দিয়ে খালি পায়ে হেঁটে যাচ্ছিলো একজন। চেহারায় ভয় আর চিন্তার ছাপ। পড়নে লাল জামা। তার নাম নুবিয়ান। পরবর্তীতে সুজান সাহসী নুবিয়ানের সাথে দেখা করে সাক্ষাৎকার নেয়। সাক্ষাৎকারটি যুক্ত করে তাঁর চলচিত্রে। নুবিয়ান সুজানকে জানায়- ন্যাশনাল গার্ড হেলিকাপ্টার থেকে তাঁর দিকে গুলি ছুড়েছিলো। গড়িয়ে গিয়ে একটা জায়গায় আশ্রয় নিয়ে কোন মতে বাঁচে সে। কিন্তু তাঁর স্বামী ন্যাশনাল গার্ডের হাতে নিহত হয়। নুবিয়ান সবার কাছে চেয়ে-চিন্তে কোনমতে কাঠের তৈরী একটা ঠেলে নেয়া যায় এমন কিছু জোগাড় করে। ওটার ওপর নুবিয়ান তাঁর স্বামীকে দড়ি দিয়ে বেঁধে ঠেলে নিয়ে গিয়েছিলো বাড়ীর পেছনের উঠানে কবর দেবার জন্য। দশ বছর পর নুবিয়ান সেই ছবি তোলার দিনের কথা এবং না জানা আরো কথা সুজানকে জানায় আর জানায় ঐ সময়ে তার বয়স ছিলো মাত্র ১৪।

মনিম্বো নারী তার স্বামীকে কবর দেবার জন্য বাড়ীর পেছনের উঠানে নিয়ে যাচ্ছে। নিকারাগুয়া ১৯৭৯। ছবি সুজান ম্যাইসিলাস। ম্যাগনাম ফটোস।

মনিম্বো নারী তার স্বামীকে কবর দেবার জন্য বাড়ীর পেছনের উঠানে নিয়ে যাচ্ছে। নিকারাগুয়া ১৯৭৯। ছবি সুজান ম্যাইসিলাস। ম্যাগনাম ফটোস।

১৯৮৯ সালে জাস্টো গোনজালোস ( Justo Gonazales) নামে একজন সান্ডানিস্তা সুজানকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ব্যাখ্যা করে কেন এই বিদ্রোহে যুক্ত হয়েছিলো। জাস্টো আরো বলেন-- ‘‘নিকারাগুয়ায় অনেক অর্থনৈতিক এবং বাণিজ্যিক চাপ ছিলো। নিষেধাজ্ঞা ছিলো। অনেক ব্যবসায়ী জাতীয় অর্থনীতিকে দুর্বল করে দিয়েছিলো। তারা নিজেদের ব্যবসা ধ্বংস করেছিলো আবার পুঁজিপাট্টাও দেশের বাইরে পাচার করেছিলো। অনেক বিদ্রোহীরা এখন হতাশ। কিন্তু তাঁদের আমাদের বোঝাতে হবে। বিপ্লবীরা মিথ্যা বলেনি। এটা সত্য যে বিপ্লব তার সমস্ত প্রতিশ্রুতি রাখতে পারেনি। যার কারন ঐ দেশীয় ব্যবসায়ীরা বিপ্লবকে তার নিজ কর্মসূচি নিয়ে এগুতে দেয়নি। তারা বিপ্লবের ডানা ভেঙ্গে দিয়েছিলো।’’

১৯৮৬ সালে সুজান, রিচার্ড পি রোজারস (Richard P. Rogers 1943-2001) এবং আলফ্রেড গুজেটি (Alfredg Guzzetti) সাথে নিয়ে আবারও যৌথভাবে তৈরী করেন লিভিং এট রিস্ক: দ্যা স্টোরি অব এ নিকারাগুয়ান ফ্যামিলী নামে আরেকটি চলচিত্র (Living at Risk: The Story of a Nicaraguan Family (1986)।

৫.

২০০৪ এ সমোজা শাসন শেষ হবার ২৫ বছর পূর্তিতে সুজান তাঁর ১৯৭৮ ও ১৯৭৯ সালে তোলা ছবির মধ্যে ১৯ টি ছবি নিয়ে নিকারাগুয়ার যেসব জায়গায় তুলেছিলো সেসব জায়গায় ফিরে যান। বড় বড় বিল বোর্ডের মতো ফ্রেমে মুরাল প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করেন। সুজান নিকারাগুয়া ফিরে যান এই ‘মেমোরী প্রজেক্ট ’ নিয়ে যার নামকরন করেন ‘‘রিফ্রেমিং হিস্ট্রী’’। এই নামে তিনি কয়েক দশক আগে নিকারাগুয়ার যুদ্ধ চলাকালীন সময়ের বিভিন্ন জায়গায় তোলা ছবিগুলো একই জায়গায় প্রতিস্থাপন করে প্রদর্শনীর করেন। তিনি বোঝার চেষ্টা করেন অতীত এবং বর্তমানের সম্পর্ক।

১৯৭৮ এ সুজানের তোলা ছবি প্রদর্শিত হয় ২০০৪ এ। ছবি: সুজান ম্যাইসিলাস

১৯৭৮ এ সুজানের তোলা ছবি প্রদর্শিত হয় ২০০৪ এ। ছবি: সুজান ম্যাইসিলাস

১৯৭৮-৭৯ তে তোলা ছবির মধ্য দিয়ে অতীতের পদাচারণায় বর্তমানের অনুভুতি বুঝতে পথচারীদের সাক্ষাৎকার নেয়া হয়। ইতিহাসে ফিরে গিয়ে সেখানকার মানুষ ২৫ বছর আগের লড়াই আর বর্তমান সময়ের অবস্থা নিয়ে কথা বলেন। সেসব যুক্ত হয় রিফ্রেমিং হিস্ট্রি চলচিত্রে। সমোজা শাসনের বিরূদ্ধে সানডানিস্তাদের বিজয়ের ২৫ বছর পূর্তিতে সুজানের এই কাজটি সেন্ট্রাল আমেরিকা বিশ^বিদ্যালয়ের ইতিহাস ইন্সটিটিউট এর সহযোগিতায় করা হয়।

সুজানের নিকারাগুয়ার কাজসহ প্রত্যেকটি কাজে একটি শব্দ ফিরে ফিরে আসে, শব্দটি হলো ‘কোলাবোরেশ’। সুজান যাদের ছবি তোলেন তাঁদের সাথে এমনভাবে কাজের সম্পর্ক-যুক্ততা তৈরী করেন এবং তা উপস্থাপন করেন যে কাজটি যৌথ কাজে পরিণত হয়। সুজান ছবি তোলার কাজকে দেখে ‘কোলাবোরেশন’ হিসাবে। যেটা কেবল ছবি তৈরীর মধ্যেই শেষ হয়ে যায় না। মেসিচুয়েটসে এ তাঁর প্রথম কাজ ৪৪ ইভরিং স্ট্রীট এর কাজ করার সময়, ছবি তোলার পর তিনি তাঁর সাবজেক্টকে জিজ্ঞেস করেন তাঁরা ছবির মধ্যে নিজেদের কিভাবে দেখতে পাচ্ছেন-- সেই প্রসঙ্গে। এরপর তিনি সেই পোট্রেটগুলোর পাশে তাঁদের লেখা প্রতিক্রিয়াগুলো প্রদর্শনী করে তাঁদের অনুভুতিও যুক্ত করেন। যৌথতা প্রসঙ্গে সুজান এক জায়গায় বলেন ..আমি আছি কিন্তু আমি ফোকাস হওয়া এড়াতে চাই। আমি লুকিয়ে কিছু করছি না। আমি ঐখানে নেই এমন ভানও করতে চাই না। কিন্তু যে গল্প বলছি আমি সে গল্প নই। আমি একটা সেতু, গাইড বা যার ছবি থুলছি তার কাজের সঙ্গী। এভাবেই সুজান তাঁর সমস্ত কাজে যার ছবি তুলছেন তার অংশগ্রহণ, তার স্বর-মত-ভাবনার যোগ করার বিষয়টিকে কাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে দেখেছে। যা ছাড়া তার কাজ পূর্ণাঙ্গ হয়ে উঠে না। তাই তাঁর ছবির মানুষরা তাঁদের মতামত নিয়ে জোরালো ভাবে হাজির হন তাঁর ছবি-চলচ্চিত্র এবং বইয়ে। এভাবেই তাঁর একেকটি কাজ যৌথতা আর শক্তি নিয়ে ইতিহাসের পথ দিয়ে হেঁটে বেড়ায়। নিকারাগুয়া নিয়ে সুজানের ছবি, চলচিত্র, বই, সাক্ষাৎকার সেই যৌথতার স্বাক্ষর বারবার হাজির করে। হাজির করে তাঁর চিন্তা ও চর্চার ছাপ।

লেখক: তাসলিমা আখ্তার | আলোকচিত্রী ও রাজনৈতিককর্মী

তথ্যসূত্র:

1. Beverly W. Brannan: 2012, Susan Meiselas: Introduction and & Biography. Curator of Photography, Prints & Photographs Division

2. Emily Wilson: July 30, 2018: Photographer Susan Meiselas on the Relationships She’s Built with Her Subjects.

3. Kenneth Baker: 11th May 2018 : The Magnum photographer and subject of a travelling retrospective talks about her work, from documenting conflict zones to portraits of Carnival strippers .

4. Susan Meiselas; Richard P. Rogers; AlfredgGuzzetti: 1986.Film: Living at Risk: The Story of a Nicaraguan Family

5. Susan Meiselas; Richard P. Rogers; Alfredg Guzzetti: 1991. Picture form a revolution : Film

6. Susan Meiselas; AlfredgGuzzetti: Film:2004 Reframing History

7. Susan Meiselas: 2009 :In Histroy

8. Susan Meiselas: 2018 :Mediations

9. Jim harriso: by November- December-2010: A Lens on History: Photographer Susan Meiselas’s

10. Magnum News Feed: Work Ethic: The Principles that have Shaped a Photographic Practice:

11. History.

12. Nicaragua in the 1970s.

13. Monovision: Online magazine: 17 May 2017 :Susan Meiselas: Prince Street Girls, 1976 – 1979.

14. Susan Meiselas: 10th December, 2018:A life in groundbreaking photography : HUCK

15. David Alan Harvey: 5 june 2012: BURN: Interview with Susan Mieselas

16. আমাদের বুধবার: ১৬ ফেব্রæয়ারি ২০১৯। আন্তর্জাতিক: বিশেষ নিবন্ধ: দেশে দেশে গণতন্ত্র বিনাশে হত্যা-নিমর্মতা (তৃতীয় পর্ব)

17. অনুপ সাদি: জুন ২৯, ২০১৮। নিকারাগয়ায় সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন ও বিপ্লবের পরাজয়।

18. https://en.wikipedia.org/wiki/Robert_Indiana

19. https://en.wikipedia.org/wiki/Marisol_Escobar